সাক্ষাৎকারঃ ভাষা ডোমেইন নামের জগতে টান টিন উই

 


যদি আপনি আপনার ভাষাকে ভালোবাসেন, তাহলে প্রফেসার টান টিন উইকে অস্বীকার করতে পারবেন না। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ্‌ সিঙ্গাপুর (বায়োইনফর্মেটিক সেন্টার, ডিপার্টমেন্ট অফ বায়োকেমিষ্ট্রী, ইয়ং লু লিন স্কুল অফ মেডিসিন্‌) এই ভাষা উদ্যমী ব্যক্তিটি ভাষার ক্ষেত্রে দারুন আশ্চর্যের কাজ করেছেন, বিশেষ করে ইন্টারনেটে ভারতীয় ভাষার ওপর।

 

তাঁর নেতৃত্বে, সিঙ্গাপুর প্রথম বারের জন্য চাইনিজ ওয়েবসাইট চালু করে ১৯৯৪ সালে, তামিল হরফে প্রথম তামিল ওয়েব সাইট চালু হয় ১৯৯৫ সালে, এবং একাধিক ভাষায় ওয়েবসাইট চালু হয় ১৯৯৬ সালে। কিন্তু ভাষার ক্ষেত্রে তাঁর সবচাইতে উল্লেখযোগ্য অবদান হল “ডোমেইন নামকে আন্তর্জাতিয়করন” করা (আই ডি এন) যার মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষা ব্যবহার করে ডোমেইন নাম লিখতে পারা সম্ভব হয়। সম্প্রতি কোয়েম্বাটুরে অনুষ্ঠিত হওয়া ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক্যাল তামিল কংগ্রেসের নবম তামিল ইন্টারনেট কনফারেন্সে তামিলনাডু সরকার তাঁকে ‘তামিল ইন্টারনেট ফ্রন্টায়ার আওয়ার্ড’ পুরস্কারে ভূষিত করে। 

 

ভাষা গনণার ওপর এবং বিশেষ করে ইতিহাস, এবং ডোমেইন নামকে আন্তর্জাতিয়করন করার ক্ষেত্রে উন্নতি করার ওপর একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারের জন্যে টান টিন উই যখন রাজী হয়েছিলেন সেই মুহূর্তটা ভাষাইণ্ডিয়ার ক্ষেত্রে একটা গর্বের মুহুর্ত ছিলো। নীচে তার সাক্ষাৎকারের কিছু বিশেষ অংশ উল্লেখ করা হল -

 

প্রশ্নঃ প্রফেসার টান টিন উই আপনার সাথে কথা বলার সুযোগ পাবার জন্যে ভাষাইণ্ডিয়া নিজেকে ধন্য মনে করছে। ‘ডোমেইন নামের আন্তর্জাতিয়করনের’ বিষয়ে আপনি কি আমাদের  কিছু  জানাবেন ?

 

উত্তরঃ আন্তর্জাতিয়করন ডোমেইন নাম (আইডিএন)এর সাহায্যে ইংরেজী না জানা মানুষের ক্ষেত্রে ইংরেজী ভাষা ছাড়াও অন্য ভাষার ওয়েবসাইটে (যেমন হিন্দী, তামিল অথবা অন্য যেকোন ভাষাতে) নিজের ডোমেইন নাম লিখতে সক্ষম হবেন। অর্থাৎ ইংরেজী (লাতিন)ডোমেইন নামের পরিবর্তে এবার থেকে আপনি ASCII-বিহীন চরিত্রও ব্যবহার করতে পারবেন। 

 

আন্তর্জাতিয়করন ডোমেইন নামের সম্পর্কে বলার আগে আসুন আমরা প্রথমে ‘ডোমেইন নাম’ দিয়ে শুরু করি। একটি ডোমেইন নাম বিশেষভাবে একটি ইন্টারনেট প্রোটোকল (আইপি) সামগ্রী যেমনঃ ইন্টারনেটে একটি ওয়েবসাইটের পরিচয় বহন করে। ডোমেইন সাধারনতে ডোমেইন নাম ব্যবস্থার ওপর (ডি এন এস) নির্ভর করে। ডোমেইন নামের ক্ষেত্রে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল খুব সহজেই চিহ্নিত করতে পারা ও মনে রাখতে পারার মত ওয়েবসাইটের সংখ্যাগত নামকরন। উদাহরন হিসাবে মার্চ ১৫, ২০১০ তারিখে ৮ কোটি ৪০ লক্ষ্য ডোমেইন নাম নথিভুক্ত আছে! কিন্তু কি দূর্ভাগ্যের বিষয় ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হলে আমাদের লাতিন ভাষায় টাইপ করতেই হয়।

 

প্রশ্নঃ ডোমেইন নামের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষার ব্যবহার করতে না পারার কারন কি হতে পারে?

 

উত্তরঃ ইউ.এস. এবং ASCII চরিত্রের ঐতিহাসিক প্রভূত্ব অ-ইংরেজী ব্যবহারকারীদের ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুবিধে থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। বর্তমানে লাতিন ভাষা জানা মানুষের তুলনায় লাতিন ভাষা এবং হরফ নাজান মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহার করা লোকের সংখ্যা অনেক বেশী। কিন্তু কেউ তাদের কথা চিন্তা করে না।

 

প্রশ্নঃ তাহলে, কিভাবে স্থানীয় ভাষায় ইন্টারনেটে ডোমেইন নাম ব্যবহার করার বিষয়টি শুরু হলো?

 

উত্তরঃ  ৯০ সালে যখন ভাষার বিষয়বস্তু নিয়ে ওয়েবপেজ আর্বিভূত হয়েছিলো, তখন থেকেই স্থানীয় ভাষায় ডোমেইন নামের চাহিদা শুরু হতে থাকে। তাই ভাষা প্রেমীগন ‘আন্তর্জাতিক ডোমেইন নামের’ জন্য বিশেষভাবে জোর দিতে থাকেন।

 

পৃথিবীর প্রায় ৮৩ শতাংশ মানুষ ইংরেজী ভাষায় কথা বলেননা বলে ধরে নেওয়া যায়, তাই ডোমেইন নামগুলো তাদের নিজস্ব স্থানীয় ভাষাতেই হওয়া উচিত। তাই পৃথিবীর অধিকাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের কাজের সুবিধার জন্য আই.ডি.এন. একটি গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ প্রথম পদক্ষেপ এবং স্থানীয় ভাষায় ইন্টারনেটে কাজ করার এই সুবিধাটুকু কিন্তু প্রথম অবস্থায়  তাদের নাগালের বাইরেই ছিলো।

 

১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে মার্টিন ডার্স্ট প্রথম বারের জন্য আই ডি এনের উত্থাপন করেন। আমি খুবই গর্বিত যে আমার নেতৃত্বে পরীক্ষামূলক ভাবে এটি শুরু হয় এবং অবশেষে আই ডি এন জারী হয়। এই পদ্ধতিটিকে ‘ইন্টারন্যাশনালাইজিং ডোমেইন নেমস ইন অ্যাপ্লিকেশান’ (এই ডি এন এ) বলা হয় ও এটিকে একটা নির্দিষ্ট মান হিসাবে ধরা হয় এবং এর পরবর্তীকালে একাধিক উচ্চ-পদের ডোমেইনের ক্ষেত্রে এটিকে ব্যবহার করা হয়।

 

প্রশ্নঃ বর্তমান অবস্থায় কি কোন এক ব্যক্তির পক্ষে ‘ডোমেইন নাম আন্তর্জাতিয়করন’ নথিভুক্ত করা ও ব্যবহার করা সম্ভব ?

 

উত্তরঃ যেমনটা আমি আগেই বলেছি যে, কার্য্যকরী পরিকল্পনা ইতিপূর্বেই শুরু হয় গেছিলো এবং ১৯৯৮ সাল থেকে সেটিকে সযত্নে অনুসরন করা হয়। আই ডি এন পদ্ধতিকে এক নির্দিষ্ট মানের আওতায় আনার জন্য “ইন্টারনেট কনসোরটিয়াম ফর অ্যাস্যাইণ্ড নেমস এণ্ড নাম্বার” (আই সি এ এন এন) নামের একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়।

 

লক্ষ্যে পৌঁছতে ১০ টা বছর লেগে গেছিলো। ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে আই সি এ এন এন স্থানীয় ভাষায় ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইন্টারনেটে আই ডি এন এ-র মানযুক্ত টপ্‌-লেভেল ডোমেইন নামের জন্য আন্তর্জাতিক দেশের কোড ব্যবহারকে স্বীকৃতি প্রদান করে। ২০১০ সালের মে মাসে প্রথম আই ডি এন দেশের কোড টপ্‌-লেভেল ডোমেইন ডি এন এসের রুট জোনে স্থাপিত হয়।

 

এখন, i-DNS.net র মত কোম্পানীগুলো প্রায় ৬০ টার থেকেও বেশী ভাষায় ডোমেইন নাম নথিভুক্ত করার বিষয়টিকে সমর্থন করে। এই সংখ্যাটা খুব শীঘ্রই আরো বাড়বে।

 

প্রশ্নঃ দারুন ব্যাপার। তাহলে খুব শীঘ্রই এবার আমরা হিন্দী, তামিল এবং মালায়ালম ভাষায় ব্যবহার করতে পারা ডোমেইন নাম আশা করতে পারি। কিন্তু স্থানীয় ভাষায় ইন্টারনেটে ডোমেইন নাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভাষা গনণা কিভাবে উপকৃত হবে?

 

উত্তরঃ কম্পিউটারের ব্যবহারিক উপকারিতাকে বৃহত্তর জনসাধারনের সেবায় নিয়োজিত করাই হল ভাষা গনণার প্রাথমিক উদ্দেশ্য। কম্পিউটারের ইন্টারনেটে নিজ নিজ ভাষায় কাজ করার অধিকার প্রতিটি মানুষেরেই আছে। যদি একটিবার কোন ব্যক্তি বিশেষকে ভাষার বাঁধন ভেঙে এই অধিকার প্রদান করা হয় বা তার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে সে/তিনি একজন অধিক সমাবেশি এবং প্রবুদ্ধ নাগরিক হবেন, এবং তথ্য ও জ্ঞানের সাথে সাথে তিনি হবেন সমস্ত পরিষেবারও এক অনন্য গ্রাহক। আই ডি এন প্রদান করা পরিষেবাগুলোর ভেতর এটাই হবে সবচাইতে মস্ত লাভদায়ক পরিষেবা। 

 

পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কিন্তু ইংরেজী ভাষার সাথে বিশেষ একটা পরিচিত নয়। সামান্যতম ইংরেজীর জ্ঞান ছাড়া, ইন্টারনেটের সমস্ত উপকরনের উপযোগীতা লাভ করাটা খুবই দুস্কর ব্যাপার। এটা সত্যি যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে স্থানীয় ভাষার অনেক বিষয় বস্তু জানতে পাওয়া যায়। কিন্তু কিভাবে কোন একজন ব্যক্তি সেটার উপকারীতা লাভ করতে পারবেন? ইংরেজীর জ্ঞান ছাড়া সে/তিনি কোন অবস্থাতেই ডোমেইন নাম (ওয়েবসাইট ঠিকানা) টাইপ করতে পারবেন না। একবার যদি এই বাধাটুকু কাটিয়ে ফেলা যায়, তাহলে সমস্ত জনগনই ইন্টারনেটের এই সুবিধার সদ্‌ব্যবহার করতে সক্ষম হবেন। এরফলে তারা তাদের নিজ নিজ ভাষাকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অধিক জনপ্রিয় এবং মূল্যবান করে তুলতে পারবেন। এইভাবেই আই ডি এন, ভাষা গনণার ক্ষেত্রে মানুষের উপকার করে চলেছে।

 

প্রশ্নঃ ইংরেজী ভাষা নাজানা মানুষের পক্ষে ASCII অথবা লাতিন নির্ভর ডোমেইন নামের মত, ই-মেল আই ডি হল অপর একটি বাধা। এরা কবে নাগাদ নিজেদের স্থানীয় ভাষায় একটি ই-মেল আইডি তৈরী করতে পারবেন?

 

উত্তরঃ কিছুপূর্বেই আই.সি.এ.এন.এন. টপ্‌-লেভেল পর্যায়ে ডি.এন. এর পরিচিতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে একমাত্র ইংরেজী অক্ষরে ই-মেল ঠিকানা লেখার বাধ্যবাধকতার থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তাই আজ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীগণ নিজস্ব স্থানীয় ভাষায় ই-মেল আইডি লিখতে পারবেন। 

 

প্রশ্নঃ আপনি জানেন যে, ভাষা ইণ্ডিয়া অধিকাংশ প্রধান ভারতীয় ভাষা এবং কিছুপূর্বের পোর্টেলে ইংরেজী ভাষা গনণার ক্ষেত্রে তথ্যনির্ভর সামগ্রী ছড়িয়ে দিচ্ছে। ভাষা গনণার জগতে একজন উৎসাহী এবং বিশেষজ্ঞ হিসাবে ভাষাইণ্ডিয়ার ইণ্ডিক ভাষা গনণার প্রচেষ্টাকে আপনি কোন স্থানে রাখবেন? এই বিষয়ে আপনি কোন পরামর্শ দেবেন কি?

 

উত্তরঃ  আমি ভাষা ইণ্ডিয়া দেখেছি এবং ভারতীয় ভাষার প্রসঙ্গ আসলে আমি এটিকেই উল্লেখ করবো। কিছুপূর্বেই আমি “ডোমেইন নামের আন্তর্জাতিয়করন” এর ক্ষেত্রে মিঃ মানিয়ামের (i-DNS.net International Inc) সাক্ষাৎকারটি পড়েছি। এই ক্ষেত্রে ভাষা ইণ্ডিয়ার প্রচেষ্টাকে যথেষ্ট ভাবে উৎসাহিত করা হয়।

আমার পরামর্শ হল এটিকে আরো অধিক আকর্ষণীয় সংস্থানের কেন্দ্র হিসাবে গঢ়ে তুলতে চেষ্টা করা। সাধারন মানুষকে এগিয়ে আসতে দিন যাতে তাঁরাও অনুভব করতে পারেন যে কম্পিউটারটি তাদের ব্যবহারের জন্যেই নিয়োজিত। আপনার নিজস্ব বিষয়বস্তুটি খুবই সহজ এবং সাধারন ভাষায় হওয়া উচিত। মানুষকে এই বিশাল জগতের অপরিসীম তথ্য ভাণ্ডার প্রযুক্তির বিষয়ে সজাগ করে তুলুন। অনুগ্রহ করে তাদের ইংরেজী ভাষাকে ভয় পেতে মানা করুন কেননা স্থানীয় ভাষাও ধীরে ধীরে উঠে আসছে।